নদিয়া। পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার রানাঘাট থানার অন্তর্গত বৈদ্যপুর কর্মকারপাড়ায় এক যুবকের অস্বাভাবিক মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারের পক্ষ থেকে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। মৃত যুবক সুমিত কর্মকারের মা মনিষ্ঠা কর্মকার পুলিশের কাছে দেওয়া অভিযোগপত্রে দাবি করেছেন, প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করার কথা বলে তাঁর ছেলে সুমিত কর্মকারকে তাঁর প্রেমিকা সুস্মিতা কর্মকার এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর সুমিত আর বাড়ি ফেরেননি। পরদিন বৈদ্যপুর নেতাজি সংঘ ক্লাব থেকে তাঁকে গলায় কাপড়ের ফাঁস লাগানো অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, এটি সাধারণ আত্মহত্যার ঘটনা নাও হতে পারে এবং এর পিছনে ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। তাই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য সামনে আনার দাবি জানিয়েছে পরিবার।
বৈদ্যপুর কর্মকারপাড়া, রানাঘাট থানা, নদিয়া জেলার বাসিন্দা মনিষ্ঠা কর্মকার তাঁর অভিযোগপত্রে জানিয়েছেন, তাঁর ছেলে সুমিত কর্মকারের সঙ্গে সুস্মিতা কর্মকারের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কের কথা দুই পরিবারের পাশাপাশি এলাকার কয়েকজন মানুষও জানতেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সুস্মিতার পরিবারের পক্ষ থেকে সুমিতকে জানানো হয়েছিল যে সুস্মিতা তখনও ১৮ বছর বয়সে পৌঁছায়নি এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর বিয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সুমিত নাকি এই কথাগুলি তাঁর মা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জানিয়েছিলেন।
অভিযোগকারিণীর বক্তব্য অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর ২০২৫ রাত প্রায় ১০টা নাগাদ সুস্মিতা কর্মকারের পরিবারের সদস্য ও পরিচিত কয়েকজন সুমিতকে তাঁর সঙ্গে সুস্মিতার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করার কথা বলে বাড়ি থেকে সঙ্গে করে নিয়ে যান। অভিযোগপত্রে যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অলোক কর্মকার, সুমিতা কর্মকার, সঙ্গীতা কর্মকার, সুব্রত দেবনাথ, সঞ্জয় দেবনাথ, বাণী দেবনাথ এবং মীরা কর্মকার। পরিবার জানিয়েছে, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সুমিত বাড়ি ফিরে না আসায় তাঁরা তাঁর খোঁজ শুরু করেন।
মনিষ্ঠা কর্মকারের দাবি, খোঁজাখুঁজির সময় পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন যে সুমিত বৈদ্যপুর নেতাজি সংঘ ক্লাবে রয়েছেন। পরিবারের লোকজন সেখানে পৌঁছে তাঁকে গলায় কাপড় বাঁধা অবস্থায় দেখতে পান বলে অভিযোগ। এরপর তাঁকে দ্রুত রানাঘাট মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই ঘটনার পর থেকেই পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে এবং সুমিতের মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
মৃতের মা তাঁর অভিযোগপত্রে দাবি করেছেন, তাঁর ছেলের মৃত্যুর পিছনে সুস্মিতা কর্মকারের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা থাকতে পারে বলে তাঁর সন্দেহ রয়েছে। অভিযোগে মোট আটজনকে সুমিতের মৃত্যুর জন্য দায়ী বলে উল্লেখ করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। তবে এই অভিযোগগুলির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে সম্ভব হয়নি। সুমিতের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সম্পূর্ণ ক্রম তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।
পরিবারের অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সুমিতের মৃত্যুর পর সুস্মিতা কর্মকারের পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনাক্রম নিয়েও মৃতের পরিবার সন্দেহ প্রকাশ করেছে। অভিযোগকারিণীর বক্তব্য, ছেলের মৃত্যুর পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। সেই কারণেই পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে কিছুটা দেরি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন।
মনিষ্ঠা কর্মকার আরও অভিযোগ করেছেন, ছেলের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করার পর তাঁকে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, থানায় গিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তাঁদের সঙ্গেও তাঁর ছেলের মতো ঘটনা ঘটতে পারে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পরিবার নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তার পাশাপাশি ঘটনার তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশ প্রশাসনের কাছে দাবি করা হয়েছে, ৬ অক্টোবর ২০২৫ রাত থেকে পরদিন সুমিতকে ক্লাবে পাওয়া যাওয়া এবং হাসপাতালে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা পর্যন্ত সম্পূর্ণ ঘটনাক্রম খতিয়ে দেখা হোক। একই সঙ্গে সুমিতকে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের ভূমিকা, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, সম্ভাব্য প্রমাণ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট তথ্য তদন্ত করে দেখা হোক। পরিবারের দাবি, তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হোক ঠিক কী পরিস্থিতিতে সুমিত কর্মকারের মৃত্যু হয়েছিল।
পরিবারের বক্তব্য, সুমিতের মৃত্যুতে গোটা পরিবার গভীরভাবে ভেঙে পড়েছে। এখন তাঁরা প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছেন। পরিবারের দাবি, তদন্তে যদি কারও অপরাধমূলক ভূমিকা প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। পাশাপাশি হুমকির অভিযোগও তদন্ত করে পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
বর্তমানে পুলিশের তদন্ত, সরকারি মেডিক্যাল নথি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতেই স্পষ্ট হতে পারে সুমিত কর্মকারের মৃত্যু আত্মহত্যা ছিল, নাকি এর পিছনে অন্য কারও ভূমিকা ছিল। মৃতের মা যে ষড়যন্ত্র এবং হুমকির অভিযোগ করেছেন, তার স্বাধীনভাবে সত্যতা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। অভিযোগপত্রে যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের বক্তব্যও এই প্রতিবেদনের উপাদানে পাওয়া যায়নি। পরিবার প্রশাসনের কাছে সম্পূর্ণ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দ্রুত সত্য উদঘাটন এবং ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছে।

